রূপা বাড়ৈয়ের একগুচ্ছ কবিতা--
আলোকিত স্বপ্ন
তুই এসে দাঁড়াতেই দুয়ারে দেহ-মনে শিহরণ জাগে
অগণিত তারা সংঘবদ্ধ হয় উচ্ছলিত আলো জ্বেলে
স্বস্তির এক প্রশান্তি মেখে, খোলা মাঠে স্বপ্ন'রা ঘোরে,
হলুদ বর্নের ঘাসের প্রাণ কোমল স্পর্শে সবুজে ফেরে।
বন্ধ জানালা খুলে দিতেই সূর্যের আলো ঘরে ঢোকে
স্বচ্ছ আলো ছড়িয়ে পরে আঁধার ঘুচিয়ে চারিদিকে,
নিঃসঙ্গ নীড় আলোকিত হয় সুখ ছুঁয়ে দুঃখ মুছে
অতিথি নয়, বন্ধু হয়ে চিরদিন তুই থাকিস পাশে।
অভিমান করে একা ফেলে আর যাসনে দূর দিগন্তে
পাহাড়সমো কাঁটা তুলে কখনো দিসনে প্রেম সীমান্তে,
শুন্যতার ক্লান্ত নিঃশ্বাস রেখে দিসনে স্মৃতির ফ্রেমে
শ্যাওলা জমা ভাগ্য সিঁড়ির ক্ষত মুছে বসাবো তোকে।
অনুভূতির দূর্বা ঘাসে খুঁজতে যাসনে দুঃখ'টাকে
ভুলে যা স্বপ্ন গড়তে ফেলে আশা কষ্টের মুহূর্তকে,
সুখের মুহুর্ত থাক অমলিন প্রেমের সুর বেজে উঠতে
সুখের মেঘ বর্ষা হয়ে ঝরে পরবে প্রেম দীপান্তে।
প্রেম দিয়ে করেছো জয় করো নাই ভয় দুঃখবোধ'কে
শিহরিত হয়েছি ক্ষণে ক্ষণে আবেগমাখা কথা শুনে,
প্রেম গাঙ্গে সাঁতার কেটে স্রোত ভেঙে উঠেছি কূলে
ছোট্ট নায়ের মাঝি হয়ে হাল ধরেছি পাল তুলে।
আহত পাখি একেলা মনে ছবি আঁকে স্বপ্নের রঙে
ডানা মেলে উড়তে গিয়ে পাখা যেনো না যায় ভেঙে,
বাস্তব পটে না পেলেও তোকে পাই ভাবনা জুড়ে
অন্দরমহলের অন্তঃপুরে যত্নে থাকিস সুখ পুড়ে।
মনের ঘরের প্রাণপাখি তোকে দেখি চোখ বুঁজে
বাঁধার প্রাচীর ভেঙে ফেলি অধীর হয়ে তোকে খুঁজে।
নারীর জীবন চিত্র
নারী যতই তার রক্ত জল করে
করুক সহযোগিতা সৃষ্টি কাজে
সৃষ্টির সকল ক্রেডিট পায় শুধুই পুরুষ।
নারীর ঘর নেই, সন্তান নেই, নেই সুনাম
নারীর পাওনা হিসাবে উপহার পায়
চলার পথে পদে পদে শুধুই নিন্দা আর দুর্নাম।
নারীর নিজস্ব বলতে কিছুই নেই
এমন কি--
যে মন'টা থাকার কথা ছিলো তার একান্ত
সেখানেও চলে খবরদারি আর শাসন।
সমাজ ও আইন যতই বলুক নারী সমাধিকারী
কার্যত সে জায়গাটাও থাকে খাঁখাঁ বিরান শূণ্য,
এটাই নারীর কঠিন জীবনের চিরন্তনী ভাগ্য,
নারীর জন্ম, সংসার নামক ঘানি টানার জন্য।
নারী হয় না প্রিয়জন, নারী শুধুই হয় প্রয়োজন
এটাই পুরুষতান্ত্রিক সমাজের নিয়মনীতির প্রমান।
যে নারী পুরুষের সংসার, ধর্ম উপেক্ষা করে
পা'য়ের শিকল খুলে ফেলে মুক্ত চিন্তায় শক্ত মনে
স্বাধীন মনে দাপটে চলে কুসংস্কার তুচ্ছ করে
বাঁধা বিপত্তি ছিন্ন করে সামনে চলে বীরদর্পে।
তার বেলাতেও ভিন্ন রূপ যায় দেখা সমাজ পটে
তার দিকে ভুরু কুঁচকে কুদৃষ্টিতে কুবাক্য ছুড়ে মারে
ভিন্ন প্রক্রিয়ায় তার গলা'টাও চায় চেপে ধরতে
কুলটা, অপয়া, নষ্টা বলে ধিক্কার দেয় থামিয়ে দিতে
চলার পথে পরাধীনতার শিকল চায় তার পা'য়ে পরাতে।
তবুও সে নারী যায় না থেমে চলে সামনে
সভ্য সমাজ গড়ে তুলতে সত্য সুঘ্রাণ দেয় ছড়িয়ে,
সকল নারী নত হয় সেই নারীর সৃষ্টির কাছে
অসহায় নিপিড়ীত সকল নারী শক্তি পায় ঘুরে দাঁড়াতে,
এই ভয়ের কারণে পুরুষ নারীর পা'য়ে শিকল পরিয়েছে।
বোধশক্তিহীন
সারা বিশ্বে যেন কান্নার ধ্বনি আকাশ ছুঁয়েছে
শুনতে কি পাও ভুক্তভোগীর সে কাকুতির কান্না
দেখতে কি পাও সে মিনতির হাহাকার
যদি তোমার দেখার সে অন্তর দৃষ্টি না থাকে, তবে তুমি মৃত
এই তোমার জন্য স্রষ্টা মুখ লুকিয়েছে, তুমি হয়েছো ঘৃণিত।
মানব কি আজ অন্ধ, বধির হয়ে মানবতা মুছে ফেলেছে
তোমরই জন্য "উদার হওয়ার কথা" কবি লিখে গেছে
"জীবে দয়া করে যেইজন, সেইজন সেবিছে ঈশ্বর"
"সবার উপরে মানব সত্য তাহার উপরে নেই"।
তাহলে কেন এই বৈষম্য কেন বর্বরতা কেন উদাসীনতা
জাতিতে বিভেদ, ধর্মের কোন্দল, হিংসা বিদ্বেষ অহমিকা।
মানবিকতার অন্ধ সীমাবদ্ধতায় মানব'কে বন্দী করে
ধর্ম-বর্ণে অসম্প্রদায়ের রঙ ছিটিয়ে দিয়ে
তোমরা মানব'কে দাঁড় করেছো কঠিন বিচার দণ্ডে
নির্দোষ মানব'কে বিতাড়িত করেছো সভ্য সমাজ থেকে
এ কি দুঃসাহস তোমাদের, স্রষ্টাকে দলিয়েছো পদতলে।
যে তোমাকে কয়েক দিনের জন্যে পাঠিয়ে
এই সুন্দর ভুবন দান করেছে ভুলে গিয়েছো কি তাঁরে,
তাঁর সৃষ্টি'কেই তোমরা ধ্বংস করো তাঁকে অসম্মান করে
এ অধিকার কে দিয়েছে এর ফল তোমরা ঠিক পাবে।
সন্তুষ্টি থাকা উচিৎ তোমাদের নিজ প্রাপ্তিটুকু নিয়ে
সংকীর্ণতা ছেড়ে নিজেকে বিলিয়ে দাও সভ্য জনপদে,
বেঁচে থাকো মানব সেবায় স্বপ্ন ছড়িয়ে দিগন্ত জুড়ে
কোরবানী করো পাপের কারণ সকল অহংবোধকে।
নিজেকে বিলিয়ে দাও, মানব সেবায় উৎসর্গ মনোভাবে
নিজেকে জাগাও সংগ্রামী কাজে আলোকিত রূপে
মানব সেবার মাঝেই স্বর্গের সুখ লুক্কায়িত আছে
একতাবদ্ধ হয়ে ধ্বনি উঠুক সকল মানবের মুখে
স্রষ্টার সেবায় হোক সৃষ্টি সত্যের আদর্শিকতা নিয়ে।
কে আমি, আমি কার
কে কাঁদছে করুণ সুরে, তার কি হয়েছে, কেন কাঁদছে
এ যে মর্ম বেদনায় বিচ্ছেদী কান্না অন্তর থেকে
তবে কি তার আপনজন বিয়োগ হয়েছে
এ কান্নার সুর যে বড়ই চেনা চেনা লাগছে।
কফিনে কার লাশ, কে পার্থিব মায়া ত্যাগ করেছে
কফিনের পাশে দেখছি আমার আপনজন বসে কাঁদছে,
লাশের মুখটা একটু দেখার প্রয়োজন, দেখবো কি করে
এই তো সারি সারি লোক এসেছে পর্দা খুলে মুখ দেখতে।
কফিন এর ঢাকনা খুলে মুখের পর্দা সরাতেই উঠেছি কেঁপে
একি কি দেখছি, এ যে আমারই স্বরূপ শুইয়ে রেখেছে
লালপেড়ে সাদা শাড়ী, নানান ফুলের সাজে দারুণ লাগছে,
তবে কি নিজেই লাশ হয়েছি, তাহলে দেখছি কি করে,
তবে কি অনুভূতির আত্মা মরেনি শুধু দেহ'টাই মরেছে।
অনেক লোকের আগমনে, অনেক চোখে জল দেখে
মায়ার বাঁধনে অনেক হৃদয় কেড়েছি এখন পারছি জানতে,
এতো ভালোবাসায় ঘেরা ছিলাম কখনো পারিনি বুঝতে
হতাশার কষ্ট যাতনা পেয়েছি, বাস্তব রুক্ষ আচরণ দেখে।
মনে কষ্ট নিয়ে কতবার মরতে চেয়েছি আত্মহত্যা করে
এখন ভাবছি আরো কিছুক্ষণ যদি পারতাম বাঁচতে
যদি চিৎকার করে বলতে পারতাম খুব কষ্ট হচ্ছে
তোমাদের বিয়োগে বার বার মরছি ধুঁকে ধুঁকে।
কিছুক্ষণ পরে শেষ বিদায় দিতে যাবে লাশ নিয়ে
একা আমাকে অন্ধকার কবরে নির্জনে ফেলে আসবে
শুনেছি মরার পর অনূভূতি থাকেনা, দেখছি তবে কি করে
বলতে পারছি না বিয়োগের ব্যথা শুধু দেখছি আত্মার চোখে।
আমি তো মৃত, এ দেহের এখন কোন মূল্য নেই, পঁচে যাবে
আরো কিছুক্ষন রাখতে চাইলেও, মূল্যহীন সব চাওয়া মিছে
মাটিচাপা দিতে হবে পঁচা দুর্গন্ধ কেউ চায় না রাখতে কাছে
জীবন্ত ভুবনে থাকার অধিকার নেই কোন লাশের।
লাশের পিছনে আমাকেও যেতে হলো পারলাম না থাকতে
কেনো, কিসের টানে যেতে হয়েছে বুঝলাম একেবারে শেষে
সকলে চলে গেলো লাশ সমাধি করে পিছন পানে না ফিরে
আমাকে থাকতে হলো লাশ পাহারায় নিঃস্বার্থ এক অনুভবে
জন্ম থেকেই একা ছিলাম পারলাম বুঝতে এতোদিন পরে
আমি শুধুই আমার কেউ ছিলোনা সক্ষম হলাম শেষে বুঝতে।
দুনিয়া মিছে মায়া, সকল আপনজন তিন দিনেই যায় ভুলে
তবুও থাকতে হয় সুখ-দুঃখে জীব অধিকারে একত্র প্রেমে,
ছোট্ট এ সুন্দর জীবন হতে পারে সুখ পূর্ণ অন্যকে পূর্ণ করে
জীবন মৃত্যুর দুই পাড়েতে থাকবে পূর্ণতায় অমর শান্তিতে।
অগ্নিদগ্ধ মা
ক্ষুদ্রতম একটা শব্দ "মা" যে শব্দ করেছে বিশ্ব জয়
যে শব্দ সম্পূর্ণ বর্ণমালার গৌরব বহন করে,
মা তো শুধুই মা, মা'য়ের কোন তুলনা হয় না
একমাত্র মা পারে সন্তানের জন্য জীবন উৎসর্গ করতে
কিন্তু মা'য়ের জন্য সন্তান পারে না শুধু একটি চুম্বন রাখতে।
সন্তানের মঙ্গল কামনায় একজন মা পারে
সকল অগ্নিময় যুদ্ধক্ষেত্রের কষ্ট তুচ্ছ করে জয়ী হতে,
দৈহিক বা আত্মিক ক্ষুধা নিবারণ করে
কেবল মা'ই পারে সন্তানের মুখে আহার জল তুলে দিতে।
একজন মা'ই হতে পারে যুদ্ধক্ষেত্রের বীরাঙ্গনা
তবুও মা, মা'য়ের চরণে গৌরব প্রদান কখনো চায় না,
যুদ্ধক্ষেত্র যেমন গৌরবের
একজন বীরাঙ্গনাও তেমন গৌরবের
কিন্তু কখনো কোন সন্তান মাথা উঁচু করে
বলতে পারে না, আমি বীরাঙ্গনার সন্তান।
কারণ বীরাঙ্গনা'কে সভ্য সমাজ উপাধি দিয়েছে
নিচুস্তরের অন্ধগলির পতিতালয়ের ঘৃণিত নারী
পতিতাও যে মা হতে পারে, সেটা এ সমাজ বুঝতে চায় না
পতিতার সন্তানের শুধু মা আছে, কেউ তার বাবা হয় না।
এমন মানব চিত্র, নিঃসন্দেহে বড় দুঃখের বড় লজ্জা জনক
বীরাঙ্গনার সন্তান পরিচয় দিতে গেলে জারজ হতে হয়
সভ্য এ মানব কুলে এমন সন্তান হতে কেউ চায় না
এ জাতি লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে স্বাধীন ভাষায় ভূখণ্ড পেলেও
পারে নাই স্বাধীন চেতনায় কুসংস্কার থেকে মুক্ত হতে।
অনেক বীরাঙ্গনা হয়তো নিজেকে গর্ব করে বলতে পারেনি
আমিও দেশের জন্য সর্বস্ব হারানোর ত্যাগ করেছি,
কেউ হয়তো বীরাঙ্গনা পরিচয় গোপন করতে পেরেছে
কেউ হয়তো গোপন করতে না পেরে সমাজের চাপে
আত্মহত্যা করেছে,
আর যাঁরা বীরঙ্গনার নামে বেঁচে ছিলো বা এখনো বেঁচে আছে
তাঁরা বড় অবহেলিত ভাবে জীবন যাপন করেছে,
বড় নির্মম আমাদের এ সমাজের নিয়মনীতি।
যে সমাজে মা'য়ের সম্মান নেই, মা থাকে বৃদ্ধাশ্রমে
মা হয় পতিতা, মা হয় কলঙ্কিনী, মা হয়দু'শ চরিত্রা নষ্টা
সে সমাজের সন্তান "মা দিবসে" মা'কে কি উপহার দেবে,
যদি উপহার দিতেই হয়, তবে মা'কে বৃদ্ধাশ্রমই উপহার দিক।
এখন মা সে উপহারও হাসি মুখে গ্রহণ করতে পারে
কারণ মা কখনো নিজের জন্য কিছু চায় না
মা শুধু সন্তান এবং সংসারের মঙ্গল কামনায় ধ্যানরত থাকে
মা'য়ের অন্তর অগ্নিদগ্ধ হতে হতে অনুভূতিহীন হয়ে গেছে
এখন আর মা সন্তানের অবহেলায় কষ্ট পায় না
বৃদ্ধাশ্রমের চার দেয়ালে বন্দী থেকেও সন্তানের জন্য করে মঙ্গলকামনা।
কাব্য নীড়
নিজ দক্ষতায় উচ্চে উঠবে জ্ঞানের সিঁড়ি বেয়ে
দেখবো প্রাণহীন দৃষ্টি মেলে আনন্দ পাবো মনে,
জন্ম হয়েছে পার্থিব জগতে কবিতা চাষ করতে
দ্বীপ জ্বালা সন্ধ্যায় আলো চেয়েছি স্মৃতি খুঁজতে।
কাব্য ভুবন খুঁজে পেয়েছি সহস্র পথ পেরিয়ে
জন্ম হতে ছিলাম অপেক্ষায় কাব্য নীড় গড়তে,
স্মৃতির আঁচলের সুখটুকু রেখেছি কাব্য ঝুলিতে
কষ্ট ছায়া কাব্যে এঁকেছি ক্ষোভময় রঙ তুলিতে।
কষ্টযুক্ত জীবন তরীতে বাঁচি আশা জাগিয়ে
কবিতার মাঝে অমরত্ব পেতে, চলি তাচ্ছিল্য দলিয়ে,
কাব্য ভুবনে ধ্যানরত আছি বর্ণ শব্দ গুছিয়ে
কাব্যতীর্থে শান্তির জল খুঁজি জীর্ণতা মুছিয়ে।
কাব্য মাটির কোলে শুয়ে থাকবো নিস্তব্ধ নীরবে
যেদিন দুঃখভরা ক্ষতবিক্ষত এ দেহ পাথর হবে,
অচেনা সুরছন্দে থাকবো চেনা হয়ে কাব্য সৃষ্টিতে
জীবিত আত্মা দেখবে সফলতা অদৃশ্য দৃষ্টি মেলে।
তুমি কাঁদবে একদিন নিভৃতে স্মৃতি ভোলার জন্যে
সেদিন কিছুতেই ভুলতে দেবো না থাকবো মরমে,
অভিশপ্ত প্রেম থাকবে স্মরণে স্মৃতির ছায়ায় মিশে
বঞ্চিত সুখটুকু আর্তনাদ তুলবে সাগরের সৈকতে।
হয়তো একদিন ইচ্ছা হবে একটু আমায় দেখতে
সেদিন সাগরে ছুটে যেও উদিত সূর্য স্নান দেখতে,
ঝিকিমিকি আলোর কণা হয়ে ফুটবো তরঙ্গে
অন্তরে ভাসবে অস্থির উর্মিমালা উদাস নয়নে।
আবছা আলোর ক্ষণিক স্পন্দন দৃষ্টির মিলনে
হৃদয়ে ছুটবে বেদনার নৌকা নীর
কবিতাগুলি পড়লাম। সুন্দর সচ্ছল সহজবোধ্য কবিতা। বেশ ভালো লাগলো।
ReplyDelete