ইন্দ্রাণী বন্দ্যোপাধ্যায়ের একগুচ্ছ কবিতা--
নক্সীকাঁথা
একটা নক্সীকাঁথা বুনবো
যেমন করে সাজু বুনেছিল
রূপাই কে না পাবার বিরহগাথা।
আমিও তেমনি করে
বুনে যাবো নক্সীকাঁথা।
চিরবিরহী মানব হৃদয়
দুঃখের দাবানলে
পুড়ে মরে যুগ থেকে যুগান্তরে।
একটা নক্সীকাঁথা বুনবো
যাকে পরশ করলে
তোমরা শুনতে পাবে
আমার ব্যথিত হৃদয়ের কান্না।
যেমন করে কূলবধূ রাই
হৃদয়ে শুনেছিল
শ্যামমন পাখির ডাক।
তেমনি কিছু থাকবে
নক্সীকাঁথাখানায়।
যখন চিরশান্তির ঘুমে
ঢলে পড়বে এই
বিরহ আগুনে দগ্ধ শরীর
তখন কাঁথাখানা মেলে দিও।
বিগত জীবনের প্রেম
জড়িয়ে থাকবে আমার শবদেহে।
মানুষ ছিলে তুমি
আমার কাঙালপনা ঘুচলো না
কতবার তুমি দেখিয়ে দিয়েছ
এই মাটি,এই আকাশ
বাতাসের কানাকানি
তবু সব দেখা বাকি রয়ে গেল।
তোমার জন্মদিনে
তোমাকে ঠাকুর করেছে ওরা।
নিক্তি মেপে তুলে ধরেছে
তোমার বৈভব।
ওরা তোমাকে মানুষ ভাবে নি।
ঠাকুর ভেবেছে।
তোমার কষ্টগুলো
যেগুলো তুমি বলে গেছো
তাতেও রঙ চড়িয়েছে।
বলেছে ঠাকুরের এমন কেন?,
ওরা একবার ও ভাবেনি
শোক তাপ গুলো
একটা মানুষের ছিল।
জলছাপ
এইপথে এসো না তুমি আর
চলে যাও দূর বহুদূর
কথাগুলো শেষ হয়ে গেছে
কিসে আর দিয়ে যাবে সুর।
এসোনা এসোনা তুমি ওগো
সবকথা এখন প্রলাপ।
এইপথে হেঁটে গেছো আগে
রয়ে গেছে কিছু জলছাপ।
এখন কবিতা আসে নাকো
গল্পে তে ঝুলি ভরে খালি
সাজানো বাগানে ফুল নেই
সেই কবে চলে গেছে মালি।
এবার ফিরে এলে পরে
ছেঁড়াতারে উঠবে না সুর
ভোকাট্টা ঘুড়ি ভেসেচলে
দেখো তবে আকাশের পুর।
চলে গেছো দলে ফুলমালা
হৃদয়কে পুড়িয়ে করে খাক
পিছুটান আর রেখো নাগো
থেকে যাক শুধু জলছাপ।
ভালোবাসা
ভালোবাসার অর্থ কী?
উত্তরটা খুঁজতেই
অভিধান নিলাম হাতে।
তন্ন তন্ন খুঁজলাম।
না!কোনো যথার্থ
উত্তর ই পেলাম না।
এবার তাকালাম
মাটির পৃথিবীর দিকে।
দেখলাম আমাদের
রাসমণিকে।
হাত ভর্তি জাম।
আমাকে ইশারা করে
চলে আয়।
ভালো করে দেখলাম।
ওই তো আমার মা।
সকাল সকাল ভাত ফোটাচ্ছে।
একটু পরেই হৈহৈ।
হ্যাঁ!আমার চিরপরিচিত ওরা।
ঠিক তখন ই
এক ঝলক ঠান্ডা বাতাস
জোরে ধাক্কা দিল।
বলে গেল
পিছনের দিকে তাকা।
সত্যি!ওই তো
হাতছানি দিয়ে ডাকছে।
এমনি কতবার ডাকে।
শৈশবের একটানা সুরে
গেয়ে উঠলাম আমি।।
আক্ষেপানুরাগ
ফিরে যাও বঁধু ফিরে যাও
আলাপখানা বিস্তার নাই পেলো
নাই বা হল সোহাগরাত্রি যাপন
এইটুকু বা কে পেয়েছে বলো?
হাসিমুখখানা দেখবো শুধু আমি
সঞ্চারীতে নাই বা গেল গান
নাই বা হল জীবনবীণার তারে
ঝঙ্কারিত শেষের বেলার তান।
যা পেয়েছি তাই বা কিসের কম
অভিমানের পালাও হবে শেষ বঁধূ তুমি চন্দ্রাবলীর ঘরে
সুখেই থেকো ভালো থেকো বেশ।
যেদিন ভরা শ্রাবণ উঁকি দেবে
প্রকৃতিজুড়ে বৃষ্টিভেজা গান
ক্ষণেক সেদিন আমার হবে জানি
ভিজবে তোমার করুণ হৃদয়খানি।
(নিউ নর্মাল)
ছাদের গল্প
একটা ছাদের গল্প বলবো ।
একটা সময় ছিল
যখন তাতে রোদের উঁকি ছিল
ছিল খেলনাবাটির
তুমি আমি সংসার ।
খুব সকালে
টিয়া শালিক খঞ্জনাদের ভিড়ে
গমগম করতো ছাদের আসর ।
বিকেল নামলে
এপাড়ার ওপাড়ার
ঘোষেদের বোসেদের মেয়েরা
সঙ্গে আনতো কূটকাচালি ।
এরপর তিনকেলে সন্ধ্যা
পাখির ডানায় আলো লুকিয়ে
কখন যে হাজির হত
কালো চুলের মাঝে
সাদার উঁকি ঝুঁকি যেন ।
রাত যত বাড়ে
সব কোলাহল স্তব্ধ হয়ে যায় ।
একা ছাদ দাঁড়িয়ে থাকে
বুকে নিয়ে বিষন্ন স্মৃতি ।
মনে করে কতকাজ
বাকি থেকে গেল ।
রাত্রের গভীরে
ছাদের কান্না আর হাহাকার
মাথাকূটে মরে ।
মাটির শরীর
জানো প্রিয়
আমার এ শরীর
মাটি বানিয়েছি ।
অদ্ভুত আবেশ
ছড়িয়ে দিয়েছি
আমার সর্ব অঙ্গে ।
যুগে যুগে
এ শরীর মাটি ।
প্রখর দহনে
বটবৃক্ষে জুগিয়েছি রস ।
বৃষ্টিকে আবাহন করে
সর্ব শরীরে লেপেছি
রোপনের দাগ ।
বন্ধুহীন জরতা নিয়ে
শীত ও এসেছিল ।
একটু উষ্ণতার জন্য
বিলাপ করেছি ।
দিনদেবে করেছি স্মরণ ।
সর্বসহা এ শরীর
মাটির মতো ।
মাটি তো সৃষ্টির কথা বলে ।
হৃদয় মাটি হলে
নতুন জীবন
বারে বারে
দিয়ে যায় উঁকি ।
কতযুগে কত মারী
নিয়ে আসে ভয় ।
মৃত্যু শাসন করে
তবু বরাভয় ।
এ শরীর মাটির মতোন ।
No comments:
Post a Comment